মৌলভীবাজার শহরতলীর বারইকোনায় মনুনদীর ভাঙন শহরের একাংশ প্লাবিত

 

 

সাইফুল ইসলাম
মৌলভীবাজারের বন্যার শহরতলীর বাড়ইকোনা এলাকায় মনুনদীর ভাঙনে মৌলভীবাজার শহর ও শহরতলীর একাংশ প্লাবিত হয়েছে।
শনিবার (১৬ জুন) দিবাগত রাত ৩টার দিকে শহরতলীর উপজেলা বারইকোনা এলাকার (উপজেলা কার্যালয়ের পেছন এলাকা) নতুন করে মনুনদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে দ্রুত গতিতে আশপাশে ছড়িয়ে পড়েছে পানি। এতে মৌলভীবাজারের সাথে সিলেটের সাথে সকল প্রকার যানচলাচল বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
বারইকোনা ভাঙন দিয়ে পানি প্রবেশ করে শহরতলীর বড়হাট এলাকা প্লাবিত হয়ে ঢাকা সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের কুসুমবাগ এলাকার রহমান ফিলিং স্টেশন ও এসআর প্লাজা হয়ে সেন্টাল রোডের দিকে পানি ঢুকে পড়েছে । প্লাবিত হয়েছে পৌরসভার বরহাট ছাড়াও কুসুমবাগ, বড়কাপন ও যোগীডহর এবং সদর উপজেলার হিলালপুর ও শেখেরগাঁও।
এদিকে,শনিবার থেকে সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে তৎপর রয়েছেন। তবে আতঙ্কে বাসিন্দারা ছুটোছুটি করছেন মালামাল নিয়ে। পুরো এলাকাজুড়ে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
শনিবার রাতে ছিলো বিপদসীমার ১৮০ সেন্টিমিটার উপরে।  রবিবার মনু নদীর পানি চাঁদনীঘাট পয়েন্টে এখন ১৫৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে, মনু স্টেশনে ৪০ সেন্টিমিটার উপর এবং কুশিয়ারা শেরপুরে ৩৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে এবং ধলাই ৪০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

জানা যায়, মনু ও ধলাই নদীর এ পর্যন্ত ২২টি স্থানে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে বন্যার পানি প্রবেশ করে কুলাউড়া, কমলগঞ্জ, রাজনগর ও সদর উপজেলার বিস্তৃর্ণ এলাকা প্লাবিত করেছে।
১৩ জুন বুধবার সকাল থেকে তলিয়ে গেছে এসব বাড়ি ঘরসহ রাস্তাঘাট। পানিবন্দি রয়েছেন জেলায় দুই লাখ মানুষ। জেলা সদরের সাথে উপজেলা সদরের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। গত ৫ দিনে জেলার বিভিন্ন স্থানে বন্যার পানির তোড়ে ভেসে গিয়ে মোট ৫ জন মারা গেছে।
তাছাড়াও সেনাবাহিনীর মেজর মোহাইমিন বিল্লার নেতৃত্বে ২১ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটালিয়ন সিলেট সেক্টরের ৭০ সদস্যের একটি টিম কাজ করে যাচ্ছেন।
শনিবার সকাল থেকে সেনাবাহিনীর দলটি মনুনদীর শহর প্রতিরক্ষা বাঁধ রক্ষায় বালি ভর্তি বস্তা ফেলে চেষ্টা চালাচ্ছেন। বন্যায় তলিয়ে যাওয়া এলাকায় আটকা পড়া মানুষ উদ্ধারে কুলাউড়া, কমলগঞ্জ ও রাজনগরে সেনাবাহিনী কাজ করছে।
পাশাপাশি শহরের বাসা বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালামাল নিরাপদ স্থানে অনেকেই সরিয়ে নিচ্ছেন। অনেকেই নীচ তলা ছেড়ে আত্মীয় স্বজনের দোতালা বাড়িতে আগে থেকেই আশ্রয় নিয়েছেন। প্রাইভেট কারসহ ব্যক্তিগত গাড়ী উঁচু স্থানে রেখেছেন।

ঈদের আগেরদিন রাতে বাঁধ ভাঙ্গার আতঙ্কে শহরবাসি রাত জেগে পাহারা দেন। আজ রবিবার সকাল পর্যন্ত তাদের একইভাবে রাত জেগে কাঠাতে হয়েছে। শহর রক্ষার জন্য মনু নদীর উত্তরপাড়ের প্রতিরক্ষা বাঁধ প্রশাসন থেকে কেটে দেয়ার গুজবে রাত জেগে বাঁধের উপর দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছেন ওই এলাকার মানুষ।

জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম জানান, ‘জেলার ৩টি উপজেলায় সেনাবাহিনী কাজ করে যাচ্ছে। এপর্যন্ত জেলায় ৩ শত ৪৩ মেট্রিক টন চাল বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে। নগদ ৫ লক্ষ টাকা বন্যা আক্রান্ত এলাকায় বিতরণ করা হচ্ছে। এ ছাড়াও আরো ৫শত মেট্রিক টন চাল ও নগদ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।’

মৌলভীবাজার পৌরসভার মেয়র মো. ফজলুর রহমান জানান, গত ৩ দিন থেকে বাঁধ রক্ষায় তিনিসহ পৌরসভার কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা কাজ করে যাচ্ছেন। ১৯৮৪ সালে শহরে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল, ওই সময়ের নদীর পানির উচ্চতার চেয়ে দুই থেকে আড়াই ফুট নদীতে পানি বেশী হয়েছে। বন্যায় যানমালের ব্যাপক ক্ষতিসহ হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল। সে দিনের ঘটনা পৌরবাসি আজও ভুলতে পারেনি। সেনাবাহিনী মনুনদীর শহর প্রতিরক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহজালাল ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রণেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী সার্বক্ষনিক শহর প্রতিরক্ষা বাঁধের তদারকি করছেন।’

মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য সাবেক চীফ হুইপ ও প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড.আব্দুস শহীদ এমপি জানান, ধলাই ও মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ রক্ষায় সেনাবাহিনীর পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসার আহবায়ন করেন। তিনি নিজেও কমলগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় রাতদিন বন্যার্ত মাঝে ত্রাণ বিতরণ করে যাচ্ছেন। পাশাপাশি বন্যার্ত মানুষের দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন।’

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রণেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী  বলেন, আজ রবিবার মনু ও ধলাই নদীর পানি কমে আসছে। রাতেই সেনাবাহিনীসহ আমরা ঘটনাস্থলে ছিলাম। বড়হাট বারইকোনা এলাকায় মনুনদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের প্রায় ৪০ মিটার ভেঙ্গে শহরের একাংশ বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানি আপাতত শহরের এম সাইফুর রহমান সড়ক (সেন্টাল রোড) পুরাতন হাসপাতাল সড়কের এর দিকে প্রবেশ করার সম্ভাবনা নেই। আমরাতো আছি তার পাশাপাশি সেনাবাহিনী,পুলিশ,ফায়ার সার্ভিস প্রশাসনের জনবলসহ সাধারণ লোকজন বাঁধ রক্ষা করতে কাজ করে যাচ্ছেন।’

শেয়ার করুন