তিন নদীর মোহনায়


ঘুরে এলাম সীমান্তবর্তী ওই জনপদ। আর দেখা হলো বরাক-সুরমা-কুশিয়ারা নদীর মিলনস্থল অমলসীদ সীমান্ত।

জকিগঞ্জ শহর থেকে বড়কুটুম আবু সাঈদ আবদুল্লাহ শাফির যান্ত্রিক দ্বিচক্রযানে ধরি অমলসীদের পথ। জকিগঞ্জ-কালীগঞ্জ সড়ক দিয়ে চলতে থাকি কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। যাত্রা শুরুর প্রথম ৩-৪ কিলোমিটার রাস্তার অবস্থা একেবারে তথৈবচ। তবে বাকি পথটুকু এক কথায় চমৎকার।

দু’পাশে ধানক্ষেতের মাঝ দিয়ে ছুটে চলেছে পিচঢালা পথ। কোথাও শীষবিহীন সবুজ নাড়া জানান দিচ্ছে সদ্য কেটে নেওয়া হয়েছে মাঠের ফসল। কোথাও সোনালি ধান দোল খাচ্ছে হেমন্তের হাওয়ায়। কোথাও আবার দলবেঁধে কৃষককে ধান কাটতে ব্যস্ত দেখা গেল। দু-এক জায়গায় রাস্তার ধারে স্তূপকারে ধান রাখতে দেখা যায়। কয়েক জায়গায় মাঠে খলা তৈরি করে ধান শুকানোর কার্যক্রম চলছে। এ কাজে কোনো কৃষককে দেখা যায়নি। কৃষাণিরাই এখানে মূল দায়িত্বরত। সবকিছু মিলে বহুদিন পর আবারও দেখা হেমন্তের গ্রামবাংলার প্রকৃত রূপ। মনে পড়ে যায় সুফিয়া কামালের সেই কথা : ‘এই তো হেমন্ত দিন এলো নব ফসল সম্ভার/অঙ্গেতে অঙ্গেতে ভারি এ রূপ আমার বাংলার।’

দু’পাশে দিগন্তজোড়া সোনালি ধানের মাঠ পেরিয়ে একে একে থানা বাজার, বাবুর বাজার, গঙ্গাজল, শরীফগঞ্জ, কামালগঞ্জ- গ্রামীণ এসব বাজার পেরিয়ে প্রায় ৩০ মিনিট পর পৌঁছি কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য অমলসীদ সীমান্তে। ভারত থেকে জন্ম নেওয়া বরাক নদী এই সীমান্তে সুরমা-কুশিয়ারা নামে বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। জকিগঞ্জ উপজেলার বারোঠাকুরী ইউনিয়নে অবস্থিত এই অমলসীদ।

স্থানীয়ভাবে ত্রিগাঙ্গা হিসেবে পরিচিত তিন নদীর মোহনাটি। অবসরে সীমান্তঘেঁষা প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে সময় কাটান প্রকৃতিপ্রেমীরা। জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে দুটি ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করে ভূমি থেকে ১৫-২০ ফুট ওপর থেকে সীমান্ত দেখার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবের তুলনায় এ উদ্যোগ অতি সামান্য। সঠিক পরিকল্পনা আর উদ্যোগ নিলে এ স্থানটি হতে পারত অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থান। প্রশাসনকে এ বিষয়ে অনেকটা উদাসীনই বলা যায়। এমনকি জেলা প্রশাসনের ওয়েব পোর্টালে দর্শনীয় স্থানের তালিকায়ও নেই তিন নদীর মোহনাযুক্ত অমলসীদ সীমান্তের নাম। ফলে পর্যটকদের আনাগোনা তেমন নেই। কর্তব্যরত এক বিজিবি সদস্য জানান, প্রতিদিন হাতেগোনা কয়েকজন পর্যটক আসেন এখানে।

সীমান্তের ওপারে আসাম প্রদেশের করিমগঞ্জের হরিনগর ক্যাম্প আর বাংলাদেশ সীমান্তে অমলসীদ বিজিবি ক্যাম্পের অবস্থান। এপারে বিজিবি আর ওপারে বিএসএফ জওয়ানরা সার্বক্ষণিক ব্যস্ত নিজেদের সীমান্ত পাহারায়। এখন শান্ত থাকলেও ২০০৬-০৭ সালে সীমান্ত উত্তেজনার কারণে সারাদেশে আলোচিত হয়ে ওঠে অমলসীদ। এখানে কর্মরত এক বিজিবি কর্মকর্তা জানান, নদীর ওপারে বাংলাদেশ সীমান্তে জেগে ওঠা একটি চরের মালিকানা নিয়ে সে সময় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সীমান্ত। তৎকালীন বিডিআরের দৃঢ় পদক্ষেপের কারণে ভারতীয় বাহিনী দখল করতে পারেনি নতুন জেগে ওঠা চরটি। এ নিয়ে বেশ কয়েক মাস যুদ্ধংদেহীভাব ছিল উভয় সীমান্তে। তবে বর্তমানে কোনো ঝামেলা নেই। কাঁটাতার দিয়ে ভারত চিহ্নিত করে নিচ্ছে তার সীমান্ত।

বর্ষা মৌসুমে জলে টইটম্বুর হয়ে উঠলে নদীর ঢেউয়ের স্পন্দনে মুখর হয়ে ওঠে অমলসীদ সীমান্ত। বর্তমানে নদীর সেই স্পন্দন নেই। ঠিক ত্রিমোহনায় গড়ে উঠেছে ত্রিমুখী চর, যা স্পষ্ট করে তুলেছে তিনটি নদীর পৃথক গতিপথ। বাংলাদেশ প্রান্তে নদীতীর সংরক্ষণে সিমেন্টের ব্লক ফেলা হয়েছে। ফলে নদীতীর আর খসে পড়েনি। অন্য প্রান্তে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়েনি। নদীর তীরজুড়ে ফলানো হয়েছে টমেটো, বেগুন, কপিসহ নানা ধরনের রবিশস্য। শাফি জানান, সীমান্তবর্তী এ অঞ্চল জোগান দেয় স্থানীয় সবজির চাহিদা। ভারতীয় প্রান্তেও সবুজ শস্যের সমারোহ দেখা গেছে।

তিন নদীর মোহনা দেখে রওনা দিই আধ্যাত্মিক সাধক শীতালং শাহের মাজার পানে। স্বল্প দূরের কাশিরচক গ্রামে চিরনিদ্রায় শায়িত এই বাউল ও সাধক পুরুষ। ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দে এখানে জন্ম নেন শীতালং শাহ। তার আসল নাম মো. ছলিমুল্লাহ। পরিণত বয়সে জকিগঞ্জ ও করিমগঞ্জের পাহাড়-জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে তিনি স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভে নিবিষ্ট হন। পরবর্তী জীবনে শীতালং শাহ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। সিলেট অঞ্চল বাউল-ফকিরদের উর্বর ভূমি। তবে অন্য বাউলদের সঙ্গে শীতালং শাহের পার্থক্য হলো- তিনি শুধু বাউল নন, ছিলেন স্রষ্টার ধ্যানে মগ্ন একজন পীরও। তরুণ গবেষক সুমনকুমার দাশ রচিত ‘বাংলাদেশের বাউল-ফকির পরিচিত ও গান’ বই থেকে জানা যায়, করিমগঞ্জেও শীতালং শাহের তলা (ফকিরি ভাষায় সাধনার স্থান) রয়েছে।

জনশ্রুতি আছে, শীতালং শাহের অনেক পূর্বাভাস পরে সত্যে পরিণত হয়েছে। জকিগঞ্জ ও করিমগঞ্জে তার বহু ভক্ত, অনুরাগী রয়েছে। ‘সুয়া উড়িল উড়িল উড়িলরে’, ‘প্রাণবন্ধু কালিয়া’, ‘আমি আপন জেনে’-এর মতো বেশ কিছু জনপ্রিয় আধ্যাত্মিক ঘরানার গান রচনা করেছেন শীতালং শাহ। যেগুলো আজও লোকমুখে শোনা যায়। ১৭৮৯ সালের ডিসেম্বরে (১৭ অগ্রহায়ণ, ১১৯৬ বঙ্গাব্দ) দেহলোক ত্যাগ করেন এ মরমি কবি ও সাধক। প্রতিবছর ১৭ অগ্রহায়ণ তার মাজার প্রাঙ্গণে ভক্ত-অনুরাগীদের মেলা বসে। কবরের পাশেই প্রতিষ্ঠা করা হয় শীতলাংগিয়া মাদ্রাসা। যেখানে প্রতিদিন দ্বীনের শিক্ষা নেয় শত শত শিক্ষার্থী।

লেখা ও ছবি : মিনহাজুল ইসলাম জায়েদ

শেয়ার করুন