লীলা নাগের পৈতৃক বাড়ির প্রাচীন ঘরটি ভেঙে পড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক, মৌলভীবাজার.

  • নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী লীলা নাগের পৈতৃক বাড়ির প্রাচীন ঘরটি সংস্কারের অভাবে ভেঙে পড়ছে। তবে বাড়ির ইজারা নিয়ে মামলা চলায় স্থানীয় প্রশাসন উদ্যোগ নিতে পারছে না। মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও ইউনিয়নের পাঁচগাঁও গ্রামে লীলা নাগের স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়ির অবস্থান।

  • প্রশাসন, গবেষক, সংগঠন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, লীলা নাগের বাবার বাড়ি মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও গ্রামে। তাঁর বাবা গিরিশ চন্দ্র নাগ আসামের গোয়ালপাড়া মহকুমার প্রশাসক থাকার সময় ১৯০০ সালের ২ অক্টোবর সেখানে তিনি জন্মলাভ করেন। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা কলকাতার ব্রাহ্ম স্কুলে। এরপর ঢাকার ইডেন গার্লস স্কুলে মাধ্যমিক এবং কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে বিএ (সম্মান) সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯২১ সালে ভর্তি হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী। বিপ্লবী ও দার্শনিক অনিল রায়ের সঙ্গে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ১৯৩৯ সালে। লীলা নাগ ইংরেজিতে এমএ পাস করে স্বদেশি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। নারীসমাজকে রাজনীতি-অর্থনীতি ও শিক্ষার মূলধারায় টেনে আনতে বহুমুখী কর্মধারার সূচনা করেন তিনি। দীপালি সংঘ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নতুনধারার নারী আন্দোলনের দ্বার উন্মোচন করেন। যোগ দিয়েছিলেন গোপন বিপ্লবী দল শ্রীসংঘে, জাগরণ মন্ত্রে উদ্দীপ্ত করেছিলেন আরও অসংখ্য তরুণীকে। তাঁর পৈতৃক ভিটার একাংশে মা কুঞ্জলতা দেবী চৌধুরীর নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। বর্তমানে এটি কুঞ্জলতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৭০ সালের ১১ জুন তিনি মারা যান।

সম্প্রতি রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁওয়ে লীলা নাগের পৈতৃক বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, পিতা গিরিশ চন্দ্র নাগের আমলে নির্মিত লোহার খুঁটি, ইটের দেয়াল ও টালির ছাদের ঘরটি সংস্কারের অভাবে ভেঙেচুরে পড়ছে। দেয়ালের ইট ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ছে। এই ঘরের বয়স শতাধিক বছর হবে বলে বাড়িতে বসবাসকারীদের ধারণা। একটি রেইনট্রিগাছ আছে, সেটিও অনেক পুরোনো। সেটির বয়স শত বছরের ওপরে হবে। বাড়ির পশ্চিম ভিটায় একটি আধাপাকা টিনের ঘর। দুই দফায় ঘরটি নির্মাণ করেছে বাড়িতে বসবাসকারী পরিবারটি।

বাড়ির বর্তমান বসবাসকারীদের একজন কুঞ্জলতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুল মুনিম চৌধুরী জানান, ১৯৬৫ সাল থেকে তাঁরা এ বাড়িতে বসবাস করছেন। তাঁর বাবা আলাউদ্দিন চৌধুরী বাড়িটি জেলা প্রশাসন থেকে ৪৫ বছরের জন্য লিজ নিয়েছিলেন। এর আগে বাড়িটি ছিল ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়। এরপর আবারও লিজের জন্য ২০১৫ সালে আবেদন করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থায়ী লিজের জন্য হাইকোর্টে একটি মামলাও করেছেন।

আবদুল মুনিম চৌধুরী বলেন, ‘আমরা লিজস্বত্বে বাড়িতে আছি। বাড়িটি নিয়ে সরকার কোনো উদ্যোগ নিলে আমাদের কিছু করার নেই। সরকার তো ব্যক্তির সম্পদও চাইলে নিয়ে নিতে পারে।’

লীলা নাগ ও বাংলার নারী জাগরণ নামে একটি বই আছে গবেষক দীপংকর মোহান্তের। তিনি  বলেন, লীলা নাগ অনেকবার এ বাড়িতে আসা-যাওয়া করেছেন। তিনি এ অঞ্চলের নারীশিক্ষার প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। তাঁর পৈতৃক বাড়িটিকে সংরক্ষণ করা দরকার। এই বাড়িটিতে একটি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা নারী টেকনিক্যাল কলেজ করা যেতে পারে। ঐতিহ্য হিসেবে বাড়ির পুরোনো ঘরটি সংরক্ষণ করা দরকার।

লীলা নাগের কর্মযজ্ঞ নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে স্থানীয়ভাবে কাজ করছে লীলা নাগ স্মৃতি পরিষদ। সংগঠনের সভাপতি কবি ইন্দ্রজিৎ দেব বলেন, ‘লীলা নাগ পাঁচগাঁওয়ের অহংকার। তাঁকে স্মরণে রাখতে, নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করতে আমরা বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। নারী জাগরণের এই অগ্রদূতের নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলে ভালো হতো।’

রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফেরদৌসী আক্তার বলেন, ‘আমি আসার পর থেকে চেষ্টা করছি কোনো একটা স্থাপনা করা যায় কি না। অনেক আগে বাড়িটি একজন লিজ নিয়েছিলেন। তিনি কয়েকবার নিম্ন আদালতে হেরে গিয়ে আপিল করেছেন। হাইকোর্ট থেকে যদি এটা শেষ হয়ে আসে, তখন উপজেলা পরিষদ থেকেই কিছু একটা স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। বিচারাধীন বিষয় থাকায় কিছু করা যাচ্ছে না। মামলার বিষয়ে জিপিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। মহামান্য হাইকোর্ট চাইলে সব তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করা হবে।’

শেয়ার করুন