সুহেল ইবনে ইসহাকের দেশপ্রেমের ৩টি কবিতা

সোনালী সেই দিনের কথা 

সিক্ত মাটির সোঁদা গন্ধ গায়ে মেখে সেই শ্যামল প্রান্তরের কানন কুসুম,

দূর্বাঘাস আর শুকনো পল্লবের মর্মর ধ্বনি পদদলিত করে,

শুভ্র কাশবন ছাড়িয়ে অপুদুর্গার মতো ছুটতে ছুটতে

কালের ভেলায় চড়ে হেঁটে চলেছিলাম এই সবুজ গ্রামে

এখনো খুঁজে বেড়াই কিশোর বেলার হারিয়ে যাওয়া

এক টুকরা নীল আকাশ,

স্মৃতিময় গ্রামের বন বাদাড়ে মিশে থাকা

দুরন্ত বালক বেলার ছায়া

কোন অবসন্ন ক্ষণে সুযোগ পেলেই স্মৃতির মধ্যে ডুব দেই

খুব একাকী কোন এক নিরালা ক্ষণে কিংবা পড়ন্তবিকেলের

কোন তমসাচ্ছন্ন বেলায় ঘুরে বেড়াই

চেতনার রঙে রাঙানো সবুজ প্রান্তরে,

খোঁজে ফিরি মনের আঙিনায় সযত্নে জমিয়ে রাখা

অতীতের সবুজ হিরণ্ময মূহুর্তগুলোকে,

যেখানে ডুব দিয়ে অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারি বিনিদ্রপ্রহর,

দীর্ঘ রজনী

মা শুটকীবৰ্তা, পিঠে, কোর্মা, পোলাও রান্না করে

আহারদান করিয়ে কী যে আনন্দ পেতেন!

সেটাই হয়ে রইলো সমুদয জীবনের সম্পদ

বাসুদেব বাড়ির রথমেলা থেকে বাবার কিনে দেয়া বাঁশেরবাঁশি, মাটির ঘোড়া,

আটকোটার বনে ঘুঘুরছানা খুঁজে ফেরা কত যে উদাসদুপুর

মরীচিকার মোহে হারিয়ে ফেলেছি সেসব হিরণ্ময়দিনগুলো,

শৈশবের স্মৃতি আজ কষ্ট নদীজলে নিমজ্জিত

বইয়ের পাতা উল্টানোর মত করে বার বার ফিরে তাকাই

ফেলে আসা স্বপ্নাতুর পর্বগুলোতে,

দোলতে থাকি স্বপ্নের দোলাচলে

আর সেই পাতা ঝরা সোনালী দিনগুলি চুপিসারে ঘুমভাঙ্গানিয়া

গান শুনিয়ে যায় কানের কাছে

রঙিনমলিন স্মৃতিমাখা অবাধ স্বাধীনতার অসাধারণকিছু দিনের কথা,

বাবামায়ের আদরশাসনভরা মুহূর্তগুলো,

ভাইবোনদের সাথে পড়ার টেবিলে করা খুঁনসুটি,

ছুটি হলেই নানাবাড়ি যাওয়ার তীব্র আনন্দ,

বিস্মৃত নাহত্তয়া শীত সকালের গরম মোয়া,

নানুর হাতের মজার মজার সব পিঠা,

সেকি মধুর সব দিনমান!

নানুর আগলে রাখা কাঠের আলমারিতে

সুযোগ পেলেই উঁকি দিয়ে বিস্কুট চুরির চেষ্টা

আরও কত কী!

সন্ধ্যা রাতে ক্ষেতের আলি ধরে বাড়ি বাড়ি বেড়াতেযাওয়া,

ভূতের ভয়ে মায়ের গায়ের সাথে সেটিয়ে হাঁটা,

চাঁদনী রাতে উঠোনে বসে তন্ময় হয়ে দাদুর মুখে গল্পশোনা,

উঠোন জুড়ে জোনাকির আলোর নাচন অবাক হয়েদেখা,

মুঠোবন্দী করার অবিরাম প্রয়াস

কী নেই সেখানে!

বিকমা ছোট গাঙের বুকে বয়ে চলা পানসী,

কচি ধানের শীষে কিংবা ঝিঙে মাচায়

ফড়িঙের ওড়াওড়ি, মনের সুখে ছোট্ট পাখি টুনটুনি

এগাছ থেকে ওগাছে লাফালাফি!

ভোর বেলায় পেয়ারাগাছে কাঠবিড়ালীর

সানন্দে হৈচৈ!

ভোরের সবুজ ঘাসের বুকে স্বচ্ছ শিশির বিন্দুর

উপর নরম রোদ পড়ে চিকচিক করে ওঠা

আর কাজীর বাজার, চাতল মাঠ, হদরপুর মাঠ সহ

প্রিয় জায়গাগুলোতে বন্ধুদের আড্ডা!

স্মৃতিভাণ্ডারের এমন হাজারো স্মৃতি হাতড়ে বেড়াতে বেড়াতে

অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি।

যেন এক অন্য জগত!

বুকের সংগোপনে লুকিয়ে রাখা এক অনন্য কল্পলোক,

যেখানে আরেকটিবার ফিরে যাওয়ার জন্য

ব্যাকুল আকুতি সবার, কিন্তু চাইলেই কি সব হয়?

ছোট থাকতে কত ভাবতাম,

ইস্, কবে যে বড় হব!”

সেইবড় হওয়া আজ ধ্রুব বটে

কিন্তু, এই বড় হওয়াই যেন নিয়ে গেল সেই বিমূর্ত প্রহরগুলো

সময়েঅসময়ে হাতছানি দিয়ে ডাকে

জীবনের অবাধ স্বাধীনতার চিন্তাহীন নির্মল এক অধ্যায় 

তাই মাঝে মাঝেই ফিরে তাকাই, ফিরে তাকাতে হয়,

ভাবতে হয় সেই সব দিনের কথা

কখনোবা ভাবতে ভাবতে ছলছল করে উঠে চোখ,

কখনোবা অকস্মা ফেটে পড়ি হাসিতে

তবুও সেসব মুহূর্তকে বুকের মাঝে আঁকড়ে ধরে ভালোই আছি।

স্বপ্নের চোখে জল

অনেকগুলো স্বপ্নের মাঝে একটা স্বপ্ন হলো

দেশটাকে উন্নত রাষ্ট্রের তালিকায় দেখা

অথচ স্বার্থের বিভীষিকায় পুড়ছে সভ্যতা, জীবন,

মাতৃগর্ভ আর মাতৃদুগ্ধের পবিত্রতা,

পুড়ছে মানুষের মুক্তির মিছিল, সংগ্রাম আর অধিকারের গান,

মানচিত্র পুড়ছে, পুড়ে খাক হচ্ছে অরণ্যের মহাস্তব্ধতা

চারদিকে নাগিনীর বিষাক্ত নিঃশ্বাস অন্তঃসার করে দিতে উদ্যত

আমাদের ঐতিহ্য, বিশ্বাস, সার্বভৌমত্ব

আজ সমস্বর বিশিষ্ট,

বিলাতী প্রভুর দাসত্ব আর রাষ্ট্রবিরোধী কারিকা

তথাপি, এই বৃষ্টিকাক ভেজা নগরে

হেটে যাওয়া যুবকের ছিড়ে যাওয়া চপ্পলের ফিতা,

কিংবা প্যান্টের পিছনে লেগে যাওয়া কাঁদায়ও স্বপ্নজমে,

দেশের সোনালী সন্তানরা স্বপ্ন দেখেন দেশমানুষের জন্য

কিন্তু আকস্মিক পৈশাচিকতায় তাঁদের স্বপ্ন থেমে যায়

স্বপ্নগুলো ফিকে হয়ে যায়।স্বপ্নের চোখে আসে জল

নীল চাদরে ঢাকা এক টুকরো বাংলাদেশ

যেখানে দৃষ্টিকাড়া বিপুল জলরাশির

উথালপাথাল মনমাতানো ঢেউ হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়

ঢেউয়ের তালে তালে নৌকা চলে আপন গতিতে

কোথাও দেখা যায় ছোট ছোট নৌকায়

জেলেরা জালের দড়ি ধরে টানছেন মাছের আশায়

পার হয়ে একটু সামনেই ছোট্ট গোছানো একটি ঘর,

যেন কাগজে আঁকা কোন শিল্পীর ছবি

কখনো নজর কাড়ে শিশুদের জলকেলি উৎসব,

কখনোবা দেখা যায় বিপুল জলরাশিকে

আগলে ধরে রেখেছে অসীম আকাশ

ঠিক তখন, টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া ভাঙ্গা হৃদয়টা

যেন পরিপাটি হয়ে বসে ভালবাসার নীল কাব্য রচনায়

চোখ যতদূর যায় যেন আকাশ নেমে গেছে জলরাশিরমধ্যে

মুড়িয়া হাওরের জলে ভেসে উঠে

সকাল, দুপুর, বিকাল রাতের বিচিত্র সমাবেশ

সকালে সারপারভারত সীমান্ত ঘেঁষে উদিত বিকালে ক্লান্ত, ডুবন্ত

সূর্যের আলোকচ্ছটা অপরূপ সৌন্দর্য্যের মহিমা তৈরি করে

পূর্ণিমা রাতে জলের ভেতর ডুবে থাকা চাঁদ

যেন ঢেউয়ের সাথেই খেলায় মগ্ন

মুড়িয়া হাওরের নীলাভ জলরাশির সাথে চাঁদের আলোর

মায়াবী সৌন্দর্য্য সুধা মনপ্রাণ ভরে উপভোগ করতে

শুরু হয় জ্যোৎস্না উৎসব

পুনশ্চ স্বচ্ছ জলের উপর বিশাল নীল আকাশ,

যেন নীল চাদরে ঢাকা এক টুকরো বাংলাদেশ

কবি সুহেল ইবনে ইসহাক, টরন্টো, কানাডা

শেয়ার করুন