‘আমার দেখা কানাডা’ -ডক্টর মুহম্মদ আব্দুস সামাদ সিকদার

বেড়াতে গিয়েছিলাম কানাডা। এ ভ্রমণে লুনা, খুরশিদ ও তাদের সন্তানদের আতিথেয়তা, ত্যাগ ও আন্তরিকতা কোনোদিন ভুলবো না।

ভুলবো না লুৎফর রহমান রিটনের কথা যিনি অটোয়া থেকে নিয়মিত খোঁজ খবর নিতেন। অটোয়ার রাহানা আশরাফ ভাবি ও আশরাফ ভাইয়ের কথাও মনে থাকবে অনেকদিন।

টরন্টোর মাসুদ ও তার স্ত্রী, রোজী, চায়না, কামরুন, বিশুভাই, এককালের সহকর্মী শরদিন্দু বাবু, বিদ্যুৎ বাবু এবং তাদের পরিবারের সকল সদস্যের আন্তরিকতা ও আতিথেয়তা কখনো ভুলবো না।

সাংবাদিক মাহবুব উসমানী ও কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের সাথে ড্যানফোর্থে যে বিশুদ্ধ আড্ডা হয়েছে তা মনে চিরজাগরুক হয়ে থাকবে।

কবি আসাদ চৌধুরী (প্রিয় আসাদ ভাই) -র সাথেতো একই মঞ্চে অনুষ্ঠান করেছি। মিজান কমপ্লেক্সের মিলনায়তনে বক্তৃতা দিয়েছি। পাশাপাশি বসে সুখ দুঃখের কথা বলেছি। ঊনার সংবর্ধনা সভায় শ্রোতা হিসেবে উপস্থিত থেকেছি। ওখানে অনেক গুনীজন উপস্থিত ছিলেন।

ডক্টর এবং ডাক্তার শাফি ভুইঁয়া কানাডার টরন্টোতে বসবাসকারী এক আলোকিত পুরুষ। আমার ভাবতে ভালো লাগে তিনি একসময়ে আমার সহকর্মী ছিলেন। তিনি এখন রায়ারসন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। গোটা বিশ্বে তার পরিচিতি। তিনি এখন বিশ্ব মানব। অনেক কিছুর সাথে জড়িত। লায়ন ইন্টারন্যাশনালের সভাপতি হয়েছেন। গভর্নরও হবেন। মানব সেবায় অবদান ও সেরা শিক্ষক হিসেবেও পুরস্কৃত তিনি। তাকে নিয়ে পৃথকভাবে লেখার ইচ্ছে আছে।

সে যাহোক, মূল কথায় ফিরে আসি। দেশে ফেবার কথা ছিল ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসের ২০ তারিখ। কিন্তু ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের ১০ তারিখে এয়ারলাইনসের টিকিট এগিয়ে আনা হলো।

কানাডার আত্নীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের প্রবল বাধা নিষেদ সত্বেও, হৃদয়ের টানে দেশে ফেরার প্রচন্ড তাগাদা অনুভব করি। তাই দেশে ফিরে আসার তারিখ এগিয়ে আনার এই ব্যবস্থা।

কেউ কেউ বলেছে থেকে যান আপনারা দুজন। পাসপোর্ট সারেন্ডার করে স্থায়ীভাবে কানাডা থাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ভালো দেখে উকিল ধরলে কয়েক মাসের মধ্যেই কেস সেটেল্ড হয়ে যাবে। তারপর নাতি, ছেলে ও ছেলের বউয়ের আনার ব্যবস্থা হবে।

উত্তর আমেরিকায় অবস্থিত কানাডা হলো বিশ্বের সেরা দেশসমুহের অন্যতম। পরিবারপরিজন নিয়ে বসবাসের জন্য এবং সবদিক থেকে উন্নত ও নিরাপদ বলা হয় কানাডাকে।

এ দেশে অনেক সুযোগ -সুবিধা রয়েছে যা আমাদের বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশসমুহে বা বিশ্বের অন্য অনেক উন্নত দেশেও নেই।

যে সকল কারণে এ দেশকে বসবাসের জন্য সেরা মনে করা হয় তার কিছু কিছু উল্লেখ করছি। অন্ন বস্ত্র শিক্ষা চিকিতসা ও বাসস্থানসহ মানুষের সকল মৌলিক চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা রয়েছে এ দেশে।
জীবন যাত্রার উন্নতমান, আইন-শৃঙ্খলা, সামাজিক নিরাপত্তার পুর্ন নিশ্চয়তা রয়েছে এখানে।

কানাডায় বসবাস করে না খেয়ে কেউ মারা যায় না। কাউকে বিনা চিকিৎসায় মরতে হয়না। সকল নাগরিকের জন্যে চিকিতসা – এ কথার বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে কানাডায়। এজন্য কানাডাকে জনকল্যাণমুখী রাস্ট্র বা ওয়েলফেয়ার স্টেটও বলা হয়ে থাকে।

মানুষের সামাজীক নিরাপত্তা বা সোশাল সিকিউরিটি এখানে প্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়।
শুনেছি, সরকারী বা বেসরকারী যে কোনো চাকুরিজীবী অর্থাৎ দেশের সব নাগরিকের জন্য আছে পেনশনের ব্যবস্থা।

কানাডায় শিক্ষাব্যবস্থাও সবার জন্য উম্মুক্ত। এক্ষেত্রে এখানে রয়েছে বহুমুখী সুযোগ সুবিধা । হাই স্কুল পর্যন্ত শিক্ষা সম্পূর্ণ ফ্রি বা অবৈতনিক। নিম্ন আয়ের পরিবারের ছেলেমেয়েদের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার জন্য টীউশন ফি ফ্রি করে দেয়া হচ্ছ। যে কোনো বয়সে যে কোনো বিষয়ে এখানে স্কুল কলেজ বা ইউনিভার্সিটিতে লেখা পড়া করা যায় ।

আর শিক্ষার ব্যয় নির্বাহের জন্য আছে বিভিন্ন ধরনের ঋণ। বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সুবিধা। আছে স্কলারশিপের ব্যবস্থা। মেধাবীছাত্র হলেতো এধরণের সুযোগ-সুবিধা প্রচুর। মা- বাবার কোনো দায়ই থাকে না।

বৃদ্ধ ব্যক্তি নিজ বাড়িতে থাকতে না চাইলে সরকারের তত্ত্বাবধানে ওল্ড হোম বা রিটায়ারমেন্ট হোম- এ তাদের থাকার ব্যবস্থা আছে। একজন লোকের বৃদ্ধ বয়সে যাতে তার প্রয়োজনমত হাতখরচ, চিকিৎসা বা থাকা খাওয়ার কষ্ট না থাকে সে বিষয়ে সরকার বিভিন্ন ব্যবস্থা নিশ্চিত করে।

কানাডার যাতয়াত ব্যবস্থা যেমন অনেক উন্নত তেমন কানাডার ট্রাফিক আইন বড় কঠিন, একটু অমান্য করলেই পুলিশের গাড়ি এসে বিশাল অঙ্কের টিকিট (জরিমানা) ধরিয়ে দেবে। শুধু তাই না লাইসেন্সের পয়েন্ট কেটে নিতে পারে কিংবা লাইসেন্স বাতিলও করে দিতে পারে ।

কানাডায় ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়াটা একটা জটিল ও কষ্টসাধ্য ব্যাপার। কানাডার রাস্তায় ইচ্ছা মতো রাস্তা-ঘাটে পার্কিং করার কথা চিন্তা করা যায় না, পার্কিং ফি দিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় গাড়ি পার্কিং করতে হয়, তা না হলে পার্কিং পুলিশ ফাইন করে দেবে। বাস অথবা গাড়ীর হর্ন খুব কম শোনা যায় মানে শব্দ-দূষণ নাই ।

জরুরী অবস্থায় হাসপাতালে যেতে ৯১১ এ কল করার পর ৩ থেকে ৫ মিনিটের মধ্যে এম্বুলেন্স এসে হাজির হবে প্যারামেডিক্সসহ। প্যারামেডিক্সরা বলতে গেলে প্রায় হাফ ডাক্তার। তারাই প্রাথমিকভাবে দেখে শুনে প্রয়োজন মনে করলে পরবর্তী ৫ থেকে ৬ মিনিটের মধ্যে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরী বিভাগে নিয়ে যাবে ।

কানাডার নাগরিকগন বিনা পয়সায় বিশ্বের সেরা চিকিৎসা পেয়ে থাকে।
কিন্তু ওষুধের জন্য একটা অর্থ ব্যয় করতে হয়। কানাডায় যে কোন ল্যাবরটরীতে ব্লাড সেম্পল এর রিডিং হবে একই ধরনের, নকল ওষুধ একথা চিন্তা করা যায় না।

কানাডার আবহাওয়া বিচিত্র। এদেশে মোটামোটি তিনটি ঋতু। তিন ঋতুতে তিন ধরনের আবহাওয়া।

আবহাওয়ার সাথে সাথে পরিবর্তন হয় চার পাশের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক দৃশাবলী। এত বিচিত্র পরিবেশ ও আবহাওয়ার দেশ এই কানাডা যে সকালে হয়তো সুন্দর রোদ, দুপুরে বৃষ্টি, বিকালে ঠাণ্ডা আর রাতে হয়তো স্নো পড়ছে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা এ দেশে সত্যিই মনুষের বন্ধু বা সাহায্যকারী। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো বলেই মানুষ দিনে বা রাতে যখনই খুশি কাজ করে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারে। কানাডায় ক্রাইম হলে পুলিশ চিরুণী দিয়ে আঁচড়ানোর মতো করে নিমিষেই ক্রিমিনাল খুঁজে বের করে ফেলে। কানাডার থানায় ডলারের লেনদেন করার কথা চিন্তা করা যায় না।

কানাডায় গাছ-পালা দিয়ে নয়নাভিরাম পার্ক বানিয়ে রেখেছে এরা। সর্বত্র শান্তি শৃংখলা ও সুন্দর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। পার্কের ভেতর পিকনিক হয় কিন্তু উচ্চস্বরে গান বাজানো হয় না, পার্কে আবর্জনা ফেলা হয় নির্দিষ্ট জায়গায়। পার্কে হকার অথবা ছিনতাইকারীর মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া সত্যিই দুষ্কর।
গভীর রাতে আমি এবং আমার পরিবার সবাই ঘুরে বেরিয়েছি বিভিন্ন পার্কে অনেক বার গিয়েছি । কোথাও কোন রকম সমস্যা হয়নি।

আহ কি শান্তি, আইন শৃঙ্খলা, সামাজিক নিরাপত্তা কত উন্নত। বিশ্বের একটি উন্নত দেশভ্রমনের সুযোগ আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন এজন্য নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে হয়।

আনন্দের ব্যাপার হচ্ছে ম্যাপল পাতার দেশ কানাডা যেতে বাংলাদেশ সহ অন্যান্য দেশের জন্য ২০১৫ সাল থেকে কানাডায় নতুন এবং আগের চেয়ে অনেক সহজ ইমিগ্রেশন প্রোগ্রাম চালু আছে।

প্রবাসীরা বলেন, কানাডায় শুধু ডলার আর ডলারের হাতছানি। বাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য খরচ শেষে হাত খালি।

কানাডার জীবনপর্ব সুন্দর ও জটিল। কানাডা উন্নত বিশ্বের একটি উন্নত দেশ, এতে কোন সন্দেহ নেই। এখানে সকলকে পরিশ্রম করে খেতে-পরতে হয়। নিজের কাজ নিজেকেই করতে হয়।

ঘরের ময়লা পরিস্কার , বাথরুম পরিস্কার, গাড়ি ধোয়া, কাপর ধোয়া, বাজার করা, রান্নাবান্না করা, গাড়ি চালানো সবকিছুই নিজেকে করতে হয়। খোদ আমেরিকা ও বৃটেনেও শুনেছি একই অবস্থা।

কানাডায় শ্রমঘন্টা কমকরে হলেও ১৫ ডলার। একজন মাঝারী মানের কর্মজীবীর আয় মাসে প্রায় সাড়ে চার হাজার কানাডিয়ান ডলার। অনেক আয়- রোজগার। বাংলাদেশী টাকায় মাসে প্রায় ২,৫০,০০০ হাজার টাকারও বেশি।তারপরও স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে চাকরি করে মাস শেষে তেমন কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।

এখানে বাড়ি ভাড়া অত্যধিক। রোজগারের প্রায় অর্ধেক খরচ হয় আবাসন খাতে। যাদের নিজেদের বাসস্হান আছে তাদের দায় ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষঠানের কাছে। এছাড়া, নানা ধরনের কাটাকাটি ও ট্যাক্সে চলে যায় ১০০০/১৫০০ ডলার। বার্ষিক আয়কর আদায় তো আছেই। যার যত বেশি আয় তার ট্যাক্স ও কর্তন তত বেশী।

গাড়ি বাড়ি কেনার সময় যে ব্যাংকলোন নেয়া থাকে তা কাটা যায় বেতন থেকেই। ক্রেডিট কার্ডের খরচের টাকার কর্তনও সেই বেতন থেকে। তারপর আছে অবশ্যম্ভাবী ইনকামট্যাক্স কর্তন।

তাই, পরিবারের অধিক স্বচ্ছলতা ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা এবং দেশ – বিদেশে ভ্রমনের কথা চিন্তা করে কেউ একাধিক চাকুরী / কাজ করে থাকেন। অনেকে ভালো চাকরি করেও অফিস সময়ের পরে অন্য কোন কাজ করে সংসারের ঘাটতি পোষায়। এ সকল পরিশ্রমী মানুষদের আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাতেই হয়।

যারা রিফিউজি, বেকার, অক্ষম বা কাজ করতে পারে না, তাদের জন্যে সরকার ন্যুনতম ভাতার ব্যবস্থা করেন।

এখানে কোন লোক না খেয়ে মারা যায় না।সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের বিষয়টি এখানে প্রাধিকার প্রাপ্ত একটি বিষয়।

ডক্টর মুহম্মদ আব্দুস সামাদ সিকদার 

শেয়ার করুন