মৌলভীবাজার প্রতিনিধি.
সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম সাইফুর রহমানের ১১ তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে মরহুমের গ্রামের বাড়ি মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বাহারমর্দনে কোরআন খতম, মিলাদ মাহফিল দোয়া ও শিরনী বিতরণ করা হয়েছে।
এ উপলক্ষে শনিবার দুপুর ১২টায় সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী প্রয়াত মন্ত্রীর কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্বা জানান।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন সাইফুর রহমানের ছেলে জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য এম নাসের রহমানসহ পরিবারের সদস্য।
পৃথকভাবে এম সাইফুর রহমান স্মৃতি পরিষদ, মৌলভীবাজার জেলা বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা কবরে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন।
পরে মৌলভীবাজার জেলা বিএনপি আয়োজিত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক এমপি এম নাসের রহমান, হবিগঞ্জ পৌর সভার সাবেক মেয়র আলহাজ¦ জিকে গৌছ, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র ফয়জুল করিম ময়ূন, সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান মিজান, জেলা যুবদল সভাপতি জাকির হোসেন উজ্বল, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি স্বাগত কিশোর দাস চৌধুরী, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মতিন বক্স, এম সাইফুর রহমান স্মৃতি পরিষদের সভাপতি সৈয়দ তৌফিক আহমদ, সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আব্দুল মতিন চৌধুরী, জেলা ছাত্রদল সভাপতি মো. রুবেল মিয়া, সাধারণ সম্পাদক আকিদুর রহমান সোহান প্রমুখ।
এরপর সিলেট বন্দর জামে মসজিদের খতিব মাওলানা মুশতাক আহমদ মিলাদ ও দোয়া পরিচালনা করেন। এদিকে বাদ যোহর ও বাদ আসর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় মসজিদগুলোতে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের উদ্দ্যোগে মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনায় মিলাদ, দোয়া ও শিরণী বিতরণ করা হয়।
প্রসঙ্গত. ২০০৯ সালে ৫ সেপ্টেম্বর মৌলভীবাজারের নিজ বাড়ি বাহারমর্দন থেকে ঢাকায় যাওয়ার সময় ঢাকা-সিলেট মহা সড়কের ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার খড়িয়ালা নামক স্থানে এক মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন।
সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী এম সাইফুর রহমান, দেশের উন্নয়ন, সিলেট বিভাগসহ নিজ জেলা মৌলভীবাজারে উন্নয়নে নিরলস কাজ করে গিয়েছিলেন। দেশের সার্বিক উন্নয়নে এক ব্যতিক্রমি ব্যক্তি ছিলেন। সর্বদা দেশ ও এলাকার সামগ্রীক উন্নয়নে সময় পার করতেন।
সাইফুর রহমান ১৯৩১ সালেরর ৬ অক্টোবর জন্মগ্রহন করেন মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বাহারমর্দন গ্রামে। মাত্র আট বছর বয়সে তার পিতা আব্দুল বাছিরকে হারান। এর পর তার তিন চাচা দেখভালের দায়িত্ব নেন। ১৯৪৯ সালে মৌলভীবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তিনি মেট্রিক পাশ করেন।
১৯৫১ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে ইন্টারমেডিয়েট পাশ করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। পরের বছর ১৯৫৪ সালে তিনি চার্টার্ড একাউন্টেন্ট এ পড়ার জন্য লন্ডনে চলে যান। সেখানে তিনি ইংল্যান্ড ও ওয়েলস এর চার্টার্ড একাউন্টেন্টে ইনস্টিটিউট থেকে ১৯৫৯ সালে উর্ত্তীণ হয়ে সার্টিফিকেট অর্জন করেন। এর পর তিনি অর্থবিষয়ক এবং উন্নয়নমূলক অর্থনীতির একজন বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেন।
সাইফুর রহমান মন্ত্রিত্বের প্রথম দিক অর্থাৎ ১৯৭৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত বাণিজ্য মন্ত্রীর দ্বায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তী ১২ বছর তিনি অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮০ থেকে ১৯৮১ সাল দুই বার, ১৯৯১-১৯৯৫ সাল পর্যন্ত ৫বার এবং ২০০২-২০০৬ সালে ৫বার সহ দীর্ঘ ১২টি বাজেট একজন সফল অর্থনীতিবিদ হিসেবে পেশ করে উপমহাদেশসহ তথা গোটা বিশ্বে রেকর্ড সৃষ্টি করেন।
রাজনীতিতে অনুষ্ঠানিকভাবে যোগদানের করেন ১৯৭৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর।
ব্যক্তিগত জীবন ঃ সাইফুর রহমান, দুররে সামাদ রহমানকে বিয়ে করেন। তাদের তিন ছেলে এবং এক কন্যা সন্তান রয়েছে। ২০০৩ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে দুররে সামাদ রহমান মারা যান। তার ছেলে এম নাসের রহমান বাবাকে অনুসরণ করে রাজনীতিতে আসেন। ২০০৩ সালের নির্বাচনে তিনি বাবার ছেড়ে দেয়া মৌলভীবাজার-৩ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
স্বীকৃতি ও সম্মাননা ঃ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রæয়ারি ভাষা আন্দোলনে সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে অংশ নেয়ায় ৪ দিন পর ২৫ ফেব্রæয়ারি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন এম সাইফুর রহমান। তৎকালীন সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী শর্তসাপেক্ষে মুচলেকা দিলে মুক্তি দেওয়া হবে জানানো হয়। কিন্তু শর্তে রাজী না হওয়ায় কারাভোগ করেন ভাষা আন্দোলনকারী নেতা এম সাইফুর রহমান। তার এই অসামান্য অবদানের জন্য সর্বোচ্চ সম্মাননায় ২০০৫ সালে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। ১৯৯৪ সালে, তিনি স্পেনের মাদ্রিদে বিশ্ব ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সুবর্ণ জয়ন্তী সম্মেলনের গভর্নর নির্বাচিত হন।
দেশের সামগ্রীক উন্নয়নের পাশাপাশি নিজ জেলা মৌলভীবাজারের উন্নয়নে ছিল তার অগ্রণী ভ‚মিকা। সব সময় ভাবতেন সাধারণ মানুষের কল্যাণে কিছু করার। সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ২০০৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তার প্রিয় জন্মভূমি মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বাহারমর্দান থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খড়িয়ালা নামক স্থানে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।
পরে নিজ বাড়ি মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বাহারমর্দানে মা-বাবা ও তার সহধর্মীনির কবরের পাশে দাফন করা হয়। এম সাইফুর রহমান নামটি এলাকার মানুষ আজও ভুলতে পারেনি।

 

শেয়ার করুন

Leave A Reply